রবিবার, ১০ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং, রাত ৪:০৬
শিরোনাম :
রমজানে খাদ্য সরবরাহে সংকট হবে না, পর্যাপ্ত মজুত আছে: খাদ্যমন্ত্রী কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি থেকে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: গভর্নর পতনের দ্বারপ্রান্তে মোদি,দিল্লিতে বড় বিক্ষোভের ডাক ইন্ডিয়া জোটের দারিদ্র্যতা,অনিশ্চিত আবাসন ও ভ্রাম্যমাণ জীবনে শিক্ষাবঞ্চিত বেদে শিশুরা আন্তর্জাতিক ভাষা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতলেন বিএম কলেজের রিফাত বিদায় বেলায় অবরুদ্ধ দুর্নীতির বরপুত্র বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা আনসার মোল্লা স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টে সেরা গোলকিপার রিয়াদ হোসেন পতিত আ.লীগের সন্ত্রাসীরা রিকশাচালক হিসেবে হাজির হয়েছে: চিফ হুইপ বরিশালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ১০ টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশের চুক্তি সই

দারিদ্র্যতা,অনিশ্চিত আবাসন ও ভ্রাম্যমাণ জীবনে শিক্ষাবঞ্চিত বেদে শিশুরা

মেহেরাব হোসেন রিফাত,বরিশাল ।। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নাগরিক সুবিধার বিস্তারে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক শিশুরাই এখনো নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে স্থান পরিবর্তন, দারিদ্র্য, অনিশ্চিত আবাসন ও সামাজিক বৈষম্যসহ নানা কারণে বেদে সম্প্রদায়ের অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও পরিবারের স্থান পরিবর্তনের কারণে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না। আবার কোনো কোনো শিশুকে অল্প বয়সেই পরিবারের জীবিকা নির্বাহে সহযোগিতা করতে হচ্ছে।

বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। বরিশালের দপদপিয়া, তালতলী, ভাঙ্গার পাড়, রহমতপুর, দোহারিকা ও শিকারপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের বসবাসের করতে দেখা যায়। তাঁদের অনেক পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে নদী ও জনপদকেন্দ্রিক ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র পেশার সঙ্গে যুক্ত। সময়ের পরিবর্তনে তাঁদের জীবিকা ও বসবাসের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। তবে অনেক পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন ও নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা এখনো অনিশ্চিত। জীবিকার প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়ায় তাদের শিশুদের পক্ষে নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন এলাকায় গিয়ে আবার ভর্তি হওয়া কিংবা আগের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্রতা বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখা দেয়। পরিবারের আয় সীমিত হলে খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই অভিভাবকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সন্তানের শিক্ষার খরচ বহন করা অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়। কোনো কোনো শিশু অল্প বয়সেই পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি সামাজিক অবহেলা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিজ্ঞতা তাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতাও তাদের শিক্ষার সুযোগকে সীমিত করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেদে সম্প্রদায়ের এক পিতা জানান, নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁরা সন্তানদের পড়ালেখা করাতে চান। তাঁদের প্রত্যাশা, সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে পরিবারের প্রচলিত জীবিকার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নিজেদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে তাঁদের সন্তানদের একটু আলাদা চোখে দেখা হয়। তিনি আরও জানান, তাঁদের সম্প্রদায়ের কিছু পরিবারের মধ্যে সুদে ঋণ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। বর্ষাকালে কাজের সুযোগ কমে গেলে কোনো কোনো পরিবার ধারদেনা করে সংসার চালায়। তাঁর বক্তব্যে সম্প্রদায়ের ভেতরে বাল্যবিবাহ এবং বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক বিধিনিষেধের বিষয়ও উঠে আসে। এসব তথ্য তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক।

এ বিষয়ে বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মু. ইব্রাহীম খলিল বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষাবঞ্চনার পেছনে দারিদ্র্য, জীবিকার অনিশ্চয়তা, ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করতে হলে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করলেই হবে না পরিবারের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, এ জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শিক্ষা সহায়তা সহজলভ্য করা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি বেদে সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণদের শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে শিশুদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়তে পারে। যেসব শিশুর পক্ষে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন, তাদের জন্য ভ্রাম্যমাণ শিক্ষাকেন্দ্র, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নমনীয় সময়সূচিতে পাঠদানের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গেলেও যেন তাদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে জন্য বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নতুন এলাকায় সহজে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে সরকারি উদ্যোগ ও সামাজিক সহায়তার কার্যকর বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচলিত উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই এবং অন্যান্য শিক্ষা সহায়তা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করে ভর্তি, নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার ব্যয়ও শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দারিদ্র্য ও ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপনের পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। বাল্যবিবাহের প্রবণতা থাকলে তা মেয়েশিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এ জনগোষ্ঠীর মেয়েশিশুদের শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা ও পারিবারিক বাস্তবতার বিষয়গুলোও শিক্ষাবঞ্চনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি বছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস এবং ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালিত হয়। কন্যাশিশুর অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়গুলো এ দিবসগুলোর আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষাবঞ্চনার বিষয়টি শিক্ষা, দারিদ্র্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন, অনিশ্চিত জীবিকা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করতে পরিবারের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষা সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।